২৮ অক্টোবর, ২০২৬
Md Ashikur Rahman,
ছবি: নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘদিনেও সম্পন্ন হয়নি। তৎকালীন সময়ে দায়ের করা যেসব মামলা বিগত আওয়ামী লীগ সরকার স্থগিত বা নিষ্পত্তি করে দিয়েছিল, সেগুলো পুনরুজ্জীবিত করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া। শহীদ পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ড স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর শুধু একটি দিন নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের নৃশংসতা এবং এর উত্থানের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ইসলামী ছাত্রশিবির ২০০৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে দিবসটি পালন করে আসছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন শক্তির সহযোগিতায় পরিকল্পিতভাবে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল। দেশের স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদের কবলে নেয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, ‘সেদিন পরিকল্পিত হামলায় সারা দেশে আমাদের প্রায় ১৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। পল্টনে মুজাহিদ, শিপন, মাসুম, ফয়সাল ও জসিমসহ অনেকে জীবন দিয়েছেন। আহত হয়েছেন শত শত নেতাকর্মী। কিন্তু এত নির্যাতনের পরও তারা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।’
ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের পর দেশে প্রায় দুই বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয় এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত নষ্ট করে বলে তিনি অভিযোগ করেন। নিহত নেতাকর্মীদের পরিবারগুলোকে নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের পর সংঘটিত সহিংসতা এবং নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনাগুলো একই দমননীতির ধারাবাহিকতা। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন।
পিলখানা হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ওই ঘটনায় ভারতের সংশ্লিষ্টতা ছিল। দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা এবং বিডিআর সদস্যদের গ্রেফতার ও চাকরিচ্যুত করার মধ্য দিয়ে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করা হয়েছিল। এখনো অনেক সাবেক বিডিআর সদস্য বিচার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, বিগত সরকারের আমলে গুম, খুন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মাধ্যমে বিরোধী মত দমনের চেষ্টা করা হয়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি করার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, নির্যাতন এবং শেষ পর্যন্ত সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেও আদর্শিক কার্যক্রম বন্ধ করা যায়নি।
তিনি বলেন, ‘কোনো আদর্শকে হত্যা, নির্যাতন, কারাবন্দী কিংবা দেশান্তরিত করে স্তব্ধ করা যায় না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা ছাত্রসমাজের কাছে গিয়েছি। ছাত্রসমাজ আমাদের গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সমর্থন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিপুলসংখ্যক মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের দমনমূলক শাসনের অবসান হয়েছে। সেই আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
চলমান বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেসব মামলা চলছে, সেগুলোর বিচারপ্রক্রিয়ায় আমরা শুভঙ্করের ফাঁকি দেখতে পাচ্ছি। যারা পলাতক, তাদের বিরুদ্ধে রায় দেয়া হচ্ছে; অথচ যারা গ্রেফতার হয়ে আছেন, তাদের বিচার ও রায় কেন দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে না? এর পেছনে কোনো ধরনের আঁতাত রয়েছে কি না, তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করতে হবে।’
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণ রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, সংবিধান সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু পুরোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামো বহাল রেখে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, ‘তারা বলেছিল সবার আগে বাংলাদেশ। কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, সবার আগে বিএনপি। রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।’
বিদ্যুতের বিল ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একদিকে বিদ্যুতের বিল কয়েক হাজার টাকা বেশি আসছে, অন্যদিকে সামান্য অর্থের কার্ড দিয়ে জনগণকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা চলছে। জনগণ এমন শাসনব্যবস্থা প্রত্যাশা করেনি।
ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, ‘আমরা একটি দায়িত্বশীল সরকার চেয়েছিলাম, কিন্তু পেয়েছি একজন রেফারি, যারা কথায় কথায় মানুষকে কার্ড দেখাচ্ছে। আমরা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি চাই, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার চাই এবং জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চাই।’
গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ যে রায় দিয়েছে, সেই রায় উপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখাবেন না। অবিলম্বে জনগণের রায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিন। অন্যথায় জনগণ তাদের অধিকার আদায়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।’
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষা করা হলে বঙ্গভবন, গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি সামনে আসতে পারে। তাই সরকারকে ভুল পথ থেকে ফিরে এসে জনগণের দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ‘শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আমরা দেখতে পাইনি। অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে এবং দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, শহীদদের রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে। সেই আত্মত্যাগের চেতনা ধারণ করে ইসলামী ছাত্রশিবির আগামী দিনেও কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করেন ও তাদের জন্য দোয়া করেন। একইসাথে নিহতদের পরিবারের সদস্য, অনুষ্ঠানের অতিথি ও আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
এ আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন জামায়তের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, তৎকালীন ছাত্রশিবির সভাপতি, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি ড. মোবারক হোসেন, ঢাকা ৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল সোহেল। আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগরের ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।