০৩ এপ্রিল, ২০২৬
ছবি: মহামারী ও হোমিওপ্যাথি
হোমিওপ্যাথিতে মহামারীর সময়' জেনাস
এপিডেমিকাস' (Genus Epidemicus) নামক একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে মহামারীর শুরুতে অনেক রোগীর লক্ষণ পর্যালোচনা করে একটি নির্দিষ্ট ঔষধ নির্বাচন করা হয়,যা পরবর্তীতে সবার ক্ষেত্রে
প্রতিষেধক বা নিরাময়ক হিসেবে কাজ করে।
১৭৯৬ সালে ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান কর্তৃক এই পদ্ধতি আবিষ্কারের পর থেকে বিভিন্ন বৈশ্বিক মহামারীতে হোমিওপ্যাথির উল্লেখযোগ্য সাফলতা রয়েছে।হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি গত দুই শতাব্দী ধরে বিভিন্ন প্রাণঘাতী মহামারী মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
হোমিওপ্যাথিক ওষুধ বিভিন্ন সময়ে টাইফয়েড, কলেরা, ইয়েলো ফিভার, স্কারলেট ফিভার, ছোট পক্স, ডিপথেরিয়া, স্প্যানিশ ফ্লু মেনিনজাইটিস, পোলিওসহ বেশ কয়েকটি মহামারীর চিকিৎসায় সফলতা দেখায়, যা উনিশ শতকে হোমিওপ্যাথিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলে।
বিশেষ করে যখন প্রচলিত চিকিৎসায় মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি ছিল, তখন হোমিওপ্যাথির মৃদু ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়।
ঐতিহাসিক সাফল্যের প্রমাণসমূহ
✅স্কারলেট ফিভার (১৮০১): এটি ছিল হোমিওপ্যাথির প্রথম মহামারী বিজয়। জার্মানির কোনিগসলুটার শহরে স্কারলেট ফিভার ছড়িয়ে পড়লে ডা. হ্যানিম্যান 'বেলাডোনা' (Belladonna) ঔষধটি ব্যবহার করে অভাবনীয় সাফল্য পান। এটি নিরাময়ক ও প্রতিষেধক উভয় হিসেবেই কাজ করেছিল।
✅টাইফাস জ্বর (১৮১৩): নেপোলিয়নের যুদ্ধের সময় লিপজিগে টাইফাস জ্বর ছড়িয়ে পড়ে। ডা. হ্যানিম্যান ১৮৩ জন রোগীর চিকিৎসা করেন, যার মধ্যে মাত্র ২ জন মারা যান (মৃত্যুহার ১.১%)। অথচ সেই সময় অন্যান্য পদ্ধতিতে মৃত্যুহার ছিল ৩০% এর বেশি।
✅কলেরা মহামারী (১৯শ শতাব্দী):
✅১৮৩১ সালে অস্ট্রিয়ায় কলেরার সময় প্রচলিত চিকিৎসায় মৃত্যুহার ছিল ৪০%, যেখানে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় তা ছিল মাত্র ১০%।
✅১৮৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটির কলেরায় হোমিওপ্যাথির সাফল্যের হার ছিল ৯৭%, যেখানে অন্যান্য পদ্ধতিতে এই হার ছিল ৪০% থেকে ৫০%।
✅১৮৫৪ সালে লন্ডনের কলেরা মহামারীতে হোমিওপ্যাথিক হাসপাতালে মৃত্যুর হার ছিল মিডলসেক্স হাসপাতালের তুলনায় তিনগুণ কম।
✅স্প্যানিশ ফ্লু (১৯১৮): ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীতে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় মৃত্যুহার ছিল প্রায় ২৮.২%।অন্যদিকে ২৬,০০০ রোগীর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় মৃত্যুহার ছিল মাত্র ১.০৫%। বিখ্যাত ঔষধ 'জেলসেমিয়াম' (Gelsemium) তখন জীবন রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করেছিল।
✅লেপ্টোস্পাইরোসিস (কিউবা, ২০০৭): কিউবা সরকার তাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর (প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ) ওপর হোমিওপ্যাথিক প্রতিষেধক প্রয়োগ করে। এর ফলে লেপ্টোস্পাইরোসিস সংক্রমণের হার অবিশ্বাস্যভাবে কমে আসে, যা আন্তর্জাতিকভাবে একটি বড় প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়।
✅ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া: ভারত ও ব্রাজিলের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মহামারী চলাকালীন প্রতিষেধক হিসেবে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ (যেমন: Eupatorium Perfoliatum) ব্যবহার করায় আক্রান্তের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
✅সাম্প্রতিক করোনা মহামারী (COVID-19) করোনাকালে ভারতের আয়ুষ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড 'আর্সেনিকাম অ্যালবাম ৩০' ঔষধটি ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এটি রোগীদের সুস্থ হওয়ার সময় কমিয়ে আনে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। করোনাকালে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ মানুষকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছিল। বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের মতে, করোনা রোগীদের সুস্থ করে তুলতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এই পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
করোনা মহামারীতে হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে অনেক আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে।
✅হামের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি
ভ্যাক্সিন উদ্ভাবনের পূর্বে হোমিওপ্যাথি ছিল হামের জটিলতা কমানোর অন্যতম প্রধান বিকল্প পদ্ধতি।
তখন ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক চিকিৎসক হামের জটিলতা (যেমন: নিউমোনিয়া বা এনসেফালোপ্যাথি) রোধে হোমিওপ্যাথি ব্যবহার করে সফল হন।
হামের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথির সাফল্যের ঐতিহাসিক প্রমাণগুলো মূলত ১৯শ শতাব্দীর মহামারীর পরিসংখ্যান এবং হোমিওপ্যাথদের ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।
১৯শ শতাব্দীতে ইউরোপ ও আমেরিকায় যখন কলেরা, টাইফয়েড এবং হামের মতো মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তৎকালীন প্রচলিত চিকিৎসা (যেমন রক্তমোক্ষণ বা 'Bloodletting') এর তুলনায় হোমিওপ্যাথিতে মৃত্যুর হার অনেক কম ছিল।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক রেকর্ডে দেখা যায়, সে সময়ে প্রচলিত চিকিৎসায় মৃত্যুহার যেখানে ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত ছিল, সেখানে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় তা ছিল ১% থেকে ৫%-এর নিচে।
১৮৪২ থেকে ১৮৫২ সালের মধ্যে নিউ ইয়র্কের একটি অনাথ আশ্রমে ২৭০ জন শিশুর হাম ও স্কারলেট ফিভারের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি ব্যবহার করা হয়েছিল, যেখানে মৃত্যুর হার ছিল মাত্র ০.৩৭%।
ডা.স্যামুয়েল হ্যানিম্যান ১৮০১ সালে 'Belladonna' ওষুধটিকে স্কারলেট ফিভারের প্রতিষেধক হিসেবে সাফল্যের সাথে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে এই পদ্ধতিটি হামের ক্ষেত্রেও 'Morbillinum' নামক নোসোড (Nosode) ব্যবহারের ভিত্তি তৈরি করে।
ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান ও আধুনিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রমাণ করে যে, মহামারীর সময় হোমিওপ্যাথি একটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
ডা.মুহাম্মদ শাহরিয়ার ইরফান দপ্তর সম্পাদক বৈষম্য বিরোধী হোমিও আন্দোলন বাংলাদেশ
Good news
Good