১৮ অক্টোবর ২০২৬
হোম স্বাস্থ্য সারাদেশ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি ও বাণিজ্য খেলাধুলা বিনোদন আন্তর্জাতিক ধর্ম ও জীবন লাইফ স্টাইল শিক্ষা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান পরিবেশ চাকরি বা ক্যারিয়ার মতামত আইন-আদালত কৃষি ও প্রযুক্তি বিশেষ সংবাদ অপরাধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্বকাপ ফুটবল
ধর্ম ও জীবন

ইসলামি দলগুলোর ঐক্যের বাধা কোথায়?

১৭ অক্টোবর, ২০২৬

সাইফুর রহমান বাদল,
হরিণাকুণ্ডু উপজেলা (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি

ছবি: মূল ছবি


কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির কারণ, নেতৃত্বের সংকট ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার উপায়
ভূমিকা: একই দ্বীন, একই কিবলা—তবু এত বিভক্তি কেন?
বিশ্বের মুসলমানদের ধর্ম এক, কুরআন এক, রাসুলুল্লাহ ﷺ এক, কিবলা এক এবং ঈমানের মৌলিক ভিত্তিও এক। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মুসলমান আজান শুনলে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, নামাজে একই কিবলামুখী হয় এবং আল্লাহর কাছে একইভাবে হিদায়াত কামনা করে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ বিভিন্ন মতাদর্শ, দল, উপদল, সংগঠন ও নেতৃত্বের প্রশ্নে বিভক্ত। কখনো মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়, কখনো একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, আবার কখনো দ্বীনের স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন হলো, ইসলাম যখন ঐক্যের নির্দেশ দিয়েছে, তখন ইসলামি ঐক্যের পথে প্রধান বাধাগুলো কোথায়?
সমস্যাটি কি কেবল মতপার্থক্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিপূজা, দলীয় সংকীর্ণতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং আত্মসমালোচনার অভাব?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কুরআন, সুন্নাহ এবং মুসলিম সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে।
➤ ইসলামি ঐক্য সম্পর্কে কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা।
১. আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
“তোমরা সবাই সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৩।
এই আয়াত ইসলামি ঐক্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
এখানে দুটি নির্দেশ রয়েছে:
১. আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরা। ২. বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা থেকে বিরত থাকা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা দরকার। ঐক্যের অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক মুসলমানকে সব বিষয়ে একই মত পোষণ করতে হবে। বরং ঐক্যের ভিত্তি হবে আল্লাহর কিতাব, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ এবং ইসলামের স্বীকৃত মৌলিক নীতিমালা।
কোনো ব্যক্তি, দল, সংগঠন কিংবা নেতাকে এমন অবস্থানে বসানো যাবে না, যেখানে তাঁর বক্তব্যকে কুরআন-সুন্নাহর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়।
ঐক্যের কেন্দ্র হবে ইসলাম; কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন নয়।
যখন কোনো দল মনে করে, শুধু তাদের সংগঠনের মাধ্যমেই দ্বীনের কাজ করা সম্ভব, আর অন্যদের সব প্রচেষ্টা মূল্যহীন, তখন সেই মানসিকতা ঐক্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সব মতপার্থক্যই নিন্দনীয় বিভক্তি নয়। দ্বীনের মৌলিক বিষয় অক্ষুণ্ণ রেখে ইজতিহাদ, ফিকহ ও কর্মপদ্ধতিতে মতভেদ থাকতে পারে।
২. পরস্পর বিবাদ মুসলিমদের শক্তি দুর্বল করে
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ
“তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে।”
—সূরা আল-আনফাল, ৮:৪৬।
এই আয়াত মুসলিম সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
যখন একটি সংগঠন অন্য সংগঠনের বিরুদ্ধে সময়, শ্রম ও সম্পদ ব্যয় করে, যখন আলেমরা পরস্পরকে হেয় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যখন কর্মীরা দ্বীনের কাজের চেয়ে নিজেদের দলের সমালোচনার জবাব দেওয়াকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তখন সম্মিলিত শক্তি ক্ষয় হয়।
➤এর ফলে তিনটি ক্ষতি হয়:
√ দ্বীনি ক্ষতি: মানুষ দ্বীনের সৌন্দর্যের পরিবর্তে মুসলমানদের পারস্পরিক বিরোধ দেখতে পায়।
√ সাংগঠনিক ক্ষতি: জনশক্তি, অর্থ, সময় ও কর্মদক্ষতার অপচয় হয়।
√ সামাজিক ক্ষতি: মুসলমানদের মধ্যে অবিশ্বাস, বিদ্বেষ ও হতাশা বৃদ্ধি পায়।
অতএব, মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন পারস্পরিক শত্রুতায় পরিণত না হয়।
➤ ইসলামি ঐক্যের পথে প্রধান আটটি বাধা
১. দলীয় পরিচয়কে ইসলামের চেয়েও বড় করে দেখা।
এ ধরনের মানসিকতা মানুষকে সত্যের অনুসারী না বানিয়ে দলের অন্ধ অনুসারীতে পরিণত করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ ۝ مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا
“আর তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।”
—সূরা আর-রূম, ৩০:৩১–৩২।
২. নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব।
অনেক সময় ঐক্যের কথা বলা হলেও বাস্তবে নেতৃত্বের প্রশ্নে সমঝোতা তৈরি হয় না।
কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন নেতৃত্বের পদকে আমানত ও দায়িত্বের পরিবর্তে ব্যক্তিগত মর্যাদা, প্রভাব কিংবা ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
إِنَّا وَاللَّهِ لَا نُوَلِّي عَلَى هَذَا الْعَمَلِ أَحَدًا سَأَلَهُ، وَلَا أَحَدًا حَرَصَ عَلَيْهِ
“আল্লাহর কসম! আমরা এই দায়িত্ব এমন কাউকে দিই না, যে তা চায়; কিংবা যে এর প্রতি লালায়িত হয়।”
—সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম 
৩. মতপার্থক্যকে শত্রুতায় রূপান্তর করা।
কেউ যদি ভিন্নমত পোষণকারীকে অপমান করেন, তাঁর নিয়ত সম্পর্কে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলেন কিংবা প্রমাণ ছাড়া তাঁকে দ্বীনের শত্রু আখ্যা দেন, তাহলে মতপার্থক্য নৈতিক সংকটে পরিণত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ
“অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও।”
—সূরা আন-নিসা, ৪:৫৯।
৪. পারস্পরিক অবিশ্বাস ও নিয়ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা
ইসলামি সংগঠনগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার জন্য পারস্পরিক বিশ্বাস অপরিহার্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
“হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো ধারণা পাপ।”
—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২।
৫. অহংকার ও আত্মসমালোচনার অভাব।
মানুষ নিজের ভুল সহজে দেখতে চায় না। সংগঠনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কিন্তু সত্যের অনুসারী হওয়ার অর্থ হলো, সত্য নিজের পক্ষে থাকলে তা গ্রহণ করা এবং ভুল নিজের মধ্যে থাকলে তা সংশোধন করা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ অহংকারের ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন—
الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ
“অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।”
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১।
৬. আলেমদের পারস্পরিক অসম্মান ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি।
ইসলামি সমাজে আলেমদের মর্যাদা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের জ্ঞান, গবেষণা ও দ্বীনি নির্দেশনা সমাজকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا
“তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:৮৩।
৭. দাওয়াত ও সমাজসেবার পরিবর্তে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা।
ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, সৎকাজে উৎসাহিত করা এবং অন্যায় প্রতিরোধ করা।
কিন্তু কোনো সংগঠন যদি অন্য সংগঠনের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হওয়া, বেশি লোক সমবেত করা কিংবা বেশি প্রভাব বিস্তার করাকেই প্রধান সাফল্য মনে করে, তাহলে মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যেতে পারে।
৮. রাজনৈতিক ও কৌশলগত মতপার্থক্য।
ইসলামি ঐক্যের পথে রাজনৈতিক কৌশলও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, জোট গঠন, সামাজিক সংস্কার এবং আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে।
কেউ নির্বাচনী রাজনীতিকে কার্যকর পথ মনে করেন। কেউ দাওয়াত, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারকে বেশি গুরুত্ব দেন। কেউ আবার বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক পদ্ধতির সমন্বয় চান।
সমস্যা হয়  রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে—
✔ অন্য পক্ষের সব ভালো কাজ অস্বীকার করা হয়।
✔ সহযোগিতার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
✔ রাজনৈতিক বিরোধকে ঈমানের বিরোধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
✔ জনগণের কল্যাণের চেয়ে দলীয় লাভকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
✔প্রমাণ ছাড়া অন্য সংগঠনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অভিযোগ করা হয়।
➤ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ঐক্য সম্পর্কে কী শিক্ষা দেয়?
১. মুসলমান পরস্পরের ভাই
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ
“এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই।”
—সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।
রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন—
لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ
“সে তার প্রতি জুলুম করবে না, তাকে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ করবে না এবং তাকে তুচ্ছজ্ঞান করবে না।”
—সহিহ মুসলিম, হাদিস
২. মুমিনরা একটি দেহের মতো
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ
অর্থ: “মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত একটি দেহের মতো।”
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৬।
পৃথিবীর কোনো প্রান্তে মুসলমান নির্যাতিত হলে অন্য মুসলমানদের তার কষ্টের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া উচিত। কোথাও দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, দারিদ্র্য কিংবা মানবিক বিপর্যয় দেখা দিলে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তবে এই সহমর্মিতা বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি সংগঠনের পরিচয় বিলুপ্ত করা অপরিহার্য নয়। বরং সমন্বয়, মানবিক সহায়তা এবং ন্যায়সংগত সহযোগিতার মাধ্যমে ঐক্যের বাস্তব রূপ প্রকাশ করা সম্ভব।
লেখক- সাইফুর রহমান বাদল 
কলামিস্ট ও সাংবাদিক
 

Related Article
comment
Poran Hasan
25-Mar-23 | 10:03

ধন্যবাদ 🌸💚

মোঃ মনির হোসেন বকাউল
28-Sep-23 | 10:09

Good news