১৪ মে ২০২৬
হোম স্বাস্থ্য সারাদেশ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি ও বাণিজ্য খেলাধুলা বিনোদন আন্তর্জাতিক ধর্ম ও জীবন লাইফ স্টাইল শিক্ষা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান পরিবেশ চাকরি বা ক্যারিয়ার মতামত আইন-আদালত কৃষি ও প্রযুক্তি বিশেষ সংবাদ অপরাধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্বকাপ ফুটবল
সারাদেশ / জাতীয়

“ইতিহাসের তীর ঘেঁষে সমৃদ্ধির নোঙর—চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর”- পর্ব ১⁣⁣

২২ নভেম্বর, ২০২৫

মোঃ শাহরিয়ার,
লোহাগাড়া উপজেলা (চট্রগ্রাম) প্রতিনিধি

ছবি: ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম বন্দর


⁣⁣
চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার সমগ্র ইতিহাস, রাজনীতি, বিশ্ববাণিজ্য, উপনিবেশ, আধুনিক অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের জীবনরেখার অংশ। কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত এই বন্দর ২,০০০ বছরেরও অধিক পুরনো সামুদ্রিক যাত্রাপথের এক কেন্দ্রবিন্দু।

প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে তোলে ধরার চেষ্টা করছি।

প্রাচীনযুগ : নৌবাণিজ্যের প্রথম কেন্দ্র

(খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক – খ্রিস্টীয় ১০ম শতক)

চট্টগ্রাম তখন পরিচিত ছিল সত্রগ্রাম, সাতগাঁও, শাতাগাঁও, বা শতগাঁও নামে।চট্টগ্রাম উপকূল ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বণিকদের একটি নিরাপদ নৌ-অবস্থান।মসলাসহ লবণ, হাতির দাঁত, মুক্তা, কাপড় ও ধাতব দ্রব্যের বাণিজ্যের অন্যতম নৌপথ। ভারত, বার্মা (মিয়ানমার), শ্রীলঙ্কা, চীন, মালয় দ্বীপপুঞ্জের জাহাজ চট্টগ্রাম হয়ে যেত।

বঙ্গোপসাগরের গভীরতম প্রাকৃতিক মোহনা,কর্ণফুলী নদীর স্রোত জাহাজ নোঙর করার জন্য নিরাপদ,পাহাড় ও নদীর মিলন—প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার জন্য সেই সময় থেকেই চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যের কেন্দ্র।

মধ্যযুগ (১০ম–১৫শ শতক):
সুলতানি ও আরাকান রাজ্যের প্রভাব

চট্টগ্রাম বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির কেন্দ্র**

প্রাচীন যুগের বাণিজ্যিক ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে মধ্যযুগে চট্টগ্রাম আরও শক্তিশালী ও কৌশলগত আন্তর্জাতিক বন্দর হিসেবে গড়ে ওঠে। ১০ম থেকে ১৫শ শতক পর্যন্ত এ অঞ্চল কখনো বাঙালি মুসলিম সুলতানদের অধীনে, আবার কখনো আরাকান রাজ্যের দখলে ছিল—দুই শক্তির টানাপোড়েনই চট্টগ্রামের অর্থনীতি,নৌ–বাণিজ্য, প্রশাসন ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

ভৌগোলিক কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি (১০ম–১১শ শতক)
এই সময়ে চট্টগ্রামকে পূর্ব–বঙ্গ, আরাকান, আসাম ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে বিবেচনা করা হয়।কর্ণফুলী নদীর মোহনায় গভীর নোঙর ফেলতে পারা,জোয়ার–ভাটার স্রোতে জাহাজ সহজে যাওয়া–আসা করতে পারা,পাহাড়ি বন্দর হওয়ায় শত্রু আক্রমণ প্রতিহত করা সহজ হওয়া,আরাকান, ত্রিপুরা ও কামরূপ অঞ্চলে পণ্য সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবেশদ্বার ছিল বিধায় চট্টগ্রাম ছিল বানিজ্যিক মিলনকেন্দ্র।এই কারণে বহু বিদেশি বণিক চট্টগ্রামে নিজেদের স্থায়ী গুদাম (warehouse) স্থাপন করে।

সুলতানি প্রশাসনের অধীনে চট্টগ্রাম (১৩শ–১৪শ শতক)
বাংলার মুসলিম সুলতানরা চট্টগ্রামকে বাণিজ্য ও শুল্ক আদায়ের কেন্দ্র হিসেবে উন্নত করে তোলেন।

সুলতানি আমলে মূল পরিবর্তনগুলো:

কাস্টমস রাজস্ব ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে,সুলতানি আমলে। শাসকের অনুমতি ছাড়া কোনও বিদেশি জাহাজ নোঙর করতে পারত না,‘শুল্কমহল’ নামে কর সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন,পণ্যের ওপর নির্দিষ্ট শুল্ক—ঘোড়া, রেশম, মসলা, ধাতু, সুতি কাপড় ইত্যাদির উপর ভিন্ন ভিন্ন হার নির্ধারণ করেন।

PortOfficer নিয়োগ
এখনকার বন্দরের চেয়ারম্যান/হারবার মাস্টারের পূর্বসূরি হিসেবে ধরা হয়।তাঁর দায়িত্ব ছিল জাহাজের নিরাপদআগমন–প্রস্থান,পণ্য পরীক্ষা,শুল্ক আদায়,জলদস্যু দমনে নৌ–রক্ষী বাহিনী পরিচালনা,ঘাট ও গুদাম উন্নয়ন,বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে সরকারি গুদাম নির্মাণ,কাপড়, চামড়া, হাতির দাঁত ও মসলার জন্য বিশেষ গুদাম স্থাপন।

আরব–মুসলিম বণিকদের প্রভাব বৃদ্ধি

এ সময় চট্টগ্রামে আরব বণিক,পারস্য ব্যবসায়ী,মুসলিম সুফি ও নাবিক স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন
এরা স্থানীয় সমাজে ইসলাম প্রচার, আচার–অনুষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক রীতি–নীতিতে প্রভাব ফেলে।

আরাকান রাজ্যের দখল ও প্রভাব (১৪শ–১৫শ শতক)
১৩শ শতকের শেষ দিকে আরাকান রাজ্য ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ১৪শ–১৫শ শতকে চট্টগ্রামকে নিজেদের “বাণিজ্য রাজধানী” বানানোর চেষ্টা করে। চট্টগ্রামকে তারা ‘জাথিংগাম’ নামে ডাকত।
বন্দর থেকে সংগৃহীত রাজস্ব আরাকান রাজপ্রাসাদে পাঠানো হতো।তারা বন্দর রক্ষা ও কর সংগ্রহের জন্য আরাকানি নৌসেনা মোতায়েন করেন। আরাকানি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব বেড়ে যায় (বিশেষত দক্ষিণ চট্টগ্রামে)।আরাকানি ব্যবসায়ীরা  চাল, মাছ ও শুকনো খাদ্য, রপ্তানিতে এবং রত্নপাথর, ধাতব দ্রব্য ও বর্ম আমদানিতে  চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করত।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (বার্মা, শ্যাম, মালাক্কা) সঙ্গে বৃহৎ নৌ–বাণিজ্যে চট্টগ্রাম তখন আরাকান ও বাংলার যৌথ বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

নৌ–বাণিজ্যের স্বর্ণযুগ (১৩শ–১৫শ শতক)
এই সময় চট্টগ্রাম ছিল বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে ব্যস্ত বন্দরগুলোর একটি।
মূল বাণিজ্য পণ্য ছিল,উচ্চমানের সুতি ও মসলিন,মসলা,মোম, মধু,চাল, চামড়া,হাতির দাঁত রপ্তানি এবং আরব সুগন্ধি,পারস্য চীনামাটি,দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার কাঠ, নীল, ব্রোঞ্জ,ঘোড়া,রেশম, আমদানি।এই সময়ে চট্টগ্রামে আরব,পারস্য,তুর্কি,চৈনিক,সিয়াম/থাই,মালয়, সুমাত্রান বণিক নিয়মিত যাতায়াত করত।
কর্ণফুলী নদীর মোহনায় নোঙর করা বিদেশি জাহাজের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে সমসাময়িক ভ্রমণকারীরা একে বলতেন “Ship Forest of the Bay”।

 জলদস্যু সমস্যা ও বন্দর নিরাপত্তা

চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ বাণিজ্য আরব–বার্মিজ জলদস্যুদের আকর্ষণ করত।সুলতানি প্রশাসন ও আরাকানি নৌবাহিনী—দুজনেই জলদস্যু দমন কর্মসূচি চালাতে নদী পথে নৌ–টহল,পালতোলা যুদ্ধজাহাজ ‘চাঁদনী’ ব্যবহার করে বন্দর ঘাটে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা গড়ে তোলে। 
এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রাচীন চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

 ১৫শ শতকের শেষের দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান
৪০০ বছরের নৌ–বাণিজ্যের ধারাবাহিক বিকাশে চট্টগ্রাম তখন—বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে কৌশলগত বন্দর।আরাকান–বঙ্গ–আসাম বাণিজ্যের কেন্দ্র।পূর্ব ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শুল্ক অঞ্চল।দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার নৌ–রুটের মিলনস্থল।মুসলিম ও আরাকানি প্রশাসনিক সংস্কৃতির সম্মিলনস্থল।
এই সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে মুঘলদের নজর কাড়ে এবং ১৬৬৬ সালে সরাসরি মুঘল দখলে আসে—যা চট্টগ্রামের বন্দর ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করে।

Related Article