০৮ মে, ২০২৬
কাজল কান্তি দে,
ছবি: নতুন উপজেলা মাতামুহুরী মানচিত্র ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
অবশেষে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটল। কক্সবাজারের মানচিত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলো নতুন উপজেলা ‘মাতামুহুরী’।
নতুন এই পাঁচটি উপজেলা নিয়ে দেশে মোট উপজেলার সংখ্যা ৪৯৫ থেকে বেড়ে ৫০০-তে উন্নীত হলো। দীর্ঘদিনের জনদাবির পাশাপাশি গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজারের অবিসংবাদিত নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নিকারের বৈঠকে মাতামুহুরীকে উপজেলা হিসেবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মাতামুহুরী অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের স্বপ্ন পূরণের দ্বার উন্মুক্ত হলো।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২০তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রশাসনিক কাঠামোতে একযোগে বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বৈঠকে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলাকে বিভক্ত করে ‘মাতামুহুরী’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া বগুড়া সিটি করপোরেশনকে দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলাকে ভাগ করে ‘মোকামতলা’, ঠাকুরগাঁও সদরকে ভাগ করে ‘রুহিয়া’ ও ‘ভুল্লী’ এবং লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলাকে ভাগ করে ‘চন্দ্রগঞ্জ’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। নতুন এই পাঁচটি উপজেলা নিয়ে দেশে মোট উপজেলার সংখ্যা ৪৯৫ থেকে বেড়ে ৫০০-তে উন্নীত হলো।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সরকারি সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সরকারের এই পদক্ষেপকে ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজ।
চকোরিয়া উপজেলার বিশাল একটি অংশ নিয়ে মাতামুহুরী উপজেলা গঠনের দাবিটি ছিল কয়েক দশকের পুরোনো। পাহাড় ও সমতল মিলিয়ে ভৌগোলিক দূরত্ব এবং যোগাযোগ কাঠামোর কারণে দাপ্তরিক কাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা কৃষি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো স্থানীয়দের। বিভিন্ন সময় মাতামুহুরীকে আলাদা উপজেলা ঘোষণার দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশও করেছে স্থানীয়রা।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের প্রার্থী হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদ নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন- তিনি নির্বাচিত হলে মাতামুহুরীকে আলাদা উপজেলা করবেন। বিপুল ভোটে এমপি হিসেবে বিজয়ী হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সময়ক্ষেপণ করেননি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনি চকরিয়া থেকে নির্ধারিত ৭টি ইউনিয়ন পৃথক করে প্রস্তাবিত মাতামুহুরী উপজেলার খসড়া কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করেন।
পর্যায়ক্রমে সীমানা নির্ধারণ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় শেষে প্রস্তাবটি গতকাল নিকারের বৈঠকে উঠলে তা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। সরকার গঠনের এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন একটি মেগা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হওয়ায় এটিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর “কথা দিয়ে কথা রাখার” অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন মাতামুহুরীবাসী।
এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মাতামুহুরীকে উপজেলা ঘোষণার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো অঞ্চলে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন স্টেশন ও বাজারগুলোতে সাধারণ মানুষকে মিষ্টি বিতরণ ও আনন্দ উৎযাপন করতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এতদিন সামান্য দাপ্তরিক কাজের জন্য, জমির খতিয়ান তুলতে বা স্বাস্থ্যসেবা নিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চকরিয়া সদরে যেতে হতো। এতে সাধারণ মানুষের প্রচুর সময় ও অর্থের অপচয় হতো। নতুন এই উপজেলা ঘোষণার ফলে এখন ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সমাজসেবাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ‘বাড়ির কাছেই’ মিলবে।
প্রশাসনিক স্বীকৃতি মেলায় মাতামুহুরী অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব এখন বহুগুণ বেড়ে গেল বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হওয়ায় নিজস্ব প্রশাসনিক ভবন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা, শিক্ষা অফিস, এলজিইডি ও কৃষি অফিসসহ সরকারি সব দপ্তরের অবকাঠামো গড়ে উঠবে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে জাতীয় বাজেটের সরাসরি একটি অংশ মাতামুহুরীর উন্নয়নে বরাদ্দ হবে। এতে অবহেলিত এই অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের ডিসেন্ট্রালাইজেশন বা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতির এটি একটি সফল উদাহরণ। একই সঙ্গে এটি সরকারের প্রতি মাতামুহুরীর জনসাধারণের প্রত্যাশা ও আস্থারও প্রতিফলন।
প্রত্যাশিত এ ঘোষণা এলাকার সন্তান সালাহউদ্দিন আহমদ এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি ঘোষণার পর এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদায়ন এবং প্রশাসনিক অবকাঠামো দৃশ্যমান অবস্থা দেখা ও পুরোপুরি সেবা প্রদান শুরুর অপেক্ষায় আছেন স্থানীয়রা।