২১ এপ্রিল, ২০২৬
কাজল কান্তি দে,
ছবি: কক্সবাজার লোডশেডিংয়ের প্রভাবে ভয়াবহ পর্যটন শহর
বৈশাখের তীব্র খরতাপের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের জনজীবন। অসহনীয় গরমের সঙ্গে বিদ্যুতের এই সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। লোডশেডিংয়ের কারণে হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী, পর্যটক, এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (২০ এপ্রিল) জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৪ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৬৫ শতাংশ।
জানতে চাইলে সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘গরমের তীব্রতা এখনো শুরু হয়েছে মাত্র। আগামী ৪-৫ দিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে।’
এদিকে কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিতরণ বিভাগ ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় পৌর শহরসহ জেলা এবং বান্দরবানের লামা ও আলীকদমের ৬৯টি ইউনিয়নে দৈনিক প্রায় ১৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য বলছে, প্রায় ৫ লাখ ১৯ হাজার গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে পিক আওয়ারে প্রয়োজন হয় ১৫৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মকবুল আলম জানান, সোমবার সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪২ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ১০১ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৩১ মেগাওয়াট ঘাটতি থেকে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ পাই। বর্তমানে সারা দেশে একই ধরনের পরিস্থিতি চলছে।’
অন্যদিকে কক্সবাজার শহর ও হোটেল-মোটেল জোন এলাকায় প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের জন্য দৈনিক ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াট। এতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি বলেন, ‘সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা এবং সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। এ সময় তাপমাত্রা বেশি থাকে এবং অফিস-আদালত খোলা থাকে। জাতীয় গ্রিডের পাশাপাশি খুরুশকুল উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ২০-৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, যা পুরোপুরি বাতাসের ওপর নির্ভরশীল।’
হোটেল-রিসোর্টে মন্দাভাব :
জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে চলতি বছর জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে পর্যটন খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারের প্রায় ৫০০ হোটেল ও রিসোর্টে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ সড়কের হোটেল ব্যবসায়ী মুকিম খান বলেন, ‘হোটেল-মোটেল জোনে পরিস্থিতি ভয়াবহ। দিনে ৩ থেকে ৫ বার লোডশেডিং হচ্ছে। কখনো বিদ্যুৎ আসতে ৩-৪ ঘণ্টা লাগে, আবার কখনো আধা ঘণ্টা পরপর চলে যায়। এতে পর্যটকেরা বুকিং বাতিল করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘জেনারেটর চালাতে তেল প্রয়োজন, কিন্তু সংকটের কারণে চাহিদামতো পাওয়া যাচ্ছে না। আমার হোটেলে দৈনিক ১৫ লিটার প্রয়োজন হলেও ৮-১০ লিটার পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
কলাতলীর ব্লু-পাল আবাসিক হোটেলের তত্ত্বাবধায়ক সালাহ উদ্দিন জানান, প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। ডিজেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
গ্রামে ‘সোনার হরিণে’ পরিণত :
এদিকে কক্সবাজার শহরের তুলনায় উপজেলাগুলোতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও নাজুক। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে পল্লী বিদ্যুৎ অনেকের কাছে এখন ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হয়েছে।
কক্সবাজার সদর
উপজেলার খুরুশকুল এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। রাতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে তারা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না।’
মহেশখালীর হোয়ানক এলাকার ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুৎ এলেও ২০-৩০ মিনিটের বেশি থাকে না। গরমে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। মোবাইল চার্জ দেওয়াও কঠিন হয়ে গেছে।’
ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম
এদিকে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার টেকনাফ, উখিয়া, রামু, ঈদগাঁও, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও সদর উপজেলায় মোট ৭ হাজার ১৪৬টি সেচপাম্প রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ডিজেলচালিত এবং বাকি ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ ও ডিজেলনির্ভর।
কৃষি সমিতির নেতাদের দাবি, জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে বর্তমানে ৪ হাজার ২০০টির বেশি সেচপাম্প বন্ধ রয়েছে। এতে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৫৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে, যা এখন ঝুঁকির মুখে।
কয়লার সংকট মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রে
অন্যদিকে কয়লা সংকটের কারণে মহেশখালীর মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রেও উৎপাদন কমে গেছে। ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এ কেন্দ্রটির উৎপাদন বর্তমানে ১৫০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়লা সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এর আগে গত শুক্রবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে কয়লা সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে বর্তমানে কয়লা খালাস কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।
Good news
Good