৩১ অগাস্ট, ২০২৬
মোঃ আয়ুব মিয়া,
ছবি: চিত্র
চট্টগ্রামের পটিয়ার ছনহরা ষোড়শী বালা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল গনির বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিদ্যালয়ে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার ও কাগজপত্র জালিয়াতি, গাছ বিক্রির টাকা আত্মসাৎ এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ৭টি পৃথক ধারায় মামলা হয়েছে। মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য পটিয়া থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সাবেক প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন বাদীপক্ষ।
তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে প্রত্যাখ্যান করেছেন সাবেক প্রধান শিক্ষক।
মামলার নথি অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুকৃতি রানী দে বাদী হয়ে পটিয়ার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সি.আর. মামলা নং-৪১৯/২০২৬ দায়ের করেন। মামলাটি গত ১৮ জুন দায়ের করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন তহবিলের অর্থ নিজের দখলে নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ভাউচার, রেজুলেশন ও ব্যাংকসংক্রান্ত কাগজপত্র জাল এবং বিভিন্ন ব্যক্তির স্বাক্ষর নকল করে ভুয়া দলিল তৈরির অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বিদ্যালয়ের দুটি পুকুর মাছ চাষের জন্য অন্যকে দেওয়ার পর সেখানকার আয়সহ অন্যান্য অর্থের হিসাব নিয়ে অনিয়ম করা হয়েছে। ২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল পুকুর খনন বাবদ ৫০ হাজার টাকার ভাউচার এবং ৩০ আগস্ট ও ১৫ সেপ্টেম্বর ৭০ হাজার টাকা করে আয় ও একই পরিমাণ ব্যয়ের হিসাব দেখানোর বিষয়ও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া করোনাকালীন সময়ে বিদ্যালয়ের সামনে থাকা মেহগনি ও সেগুনগাছ কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে বিক্রি এবং প্রায় ৮৫ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের ক্যাশবুকে না তুলে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের ওপর করা অডিটে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৩৫৭ টাকা বিদ্যালয়ে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐ অর্থ বিদ্যালয়ের সাধারণ হিসাবে জমা দেওয়ার কথা বলা হলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার নথির পরবর্তী অংশে জুলাই ২০২৩ থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে মোট ৫ লাখ ১৫ হাজার ৩৫৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের হিসাব দেওয়া হয়েছে।
মামলার বাদী ও বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুকৃতি রানী দে বলেন, সাবেক প্রধান শিক্ষক ৬৫ বছরের বেশি বয়সে অবসরের পরও বিদ্যালয়ে থাকা, হুমকীর জন্য লোক পাঠানো এবং সভাপতি হওয়ার চেষ্টা নিয়ে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করছিলেন। তার এসব অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার চক্রান্তকে বাধাগ্রস্ত করতে বিষয়টি তৎকালীন ইউএনও ও সংসদ সদস্যকে অবহিত করার পর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত মামলা করা হয় বলে তিনি জানান।
তার দাবি, এসব অপরাধের প্রমাণপত্র, সাক্ষী ও ভাউচারসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য বিদ্যালয়ের অফিস সহকারীর কাছে রয়েছে।
বিদ্যালয়ের কিছু সাবেক শিক্ষক তার অত্যাচারে স্কুল ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এমনকি এখনো একজন শিক্ষক তার অত্যাচারে চাকরি ছেড়ে বেকার জীবনযাপন করছেন বলে জানান যায়।
অন্যদিকে, সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল গনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট নিয়ম অনুযায়ী অবসরে যাওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ ম্যানেজিং কমিটি, অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হিসাব-নিকাশ যাচাই ও অনুমোদন করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট বৈধ দাপ্তরিক নথিপত্রও তার কাছে রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও দাবি করেন, দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। ঐ ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেই একটি মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে জানান তিনি।
সভার সিদ্ধান্ত ও কার্যবিবরণীও নিয়মতান্ত্রিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
সাবেক প্রধান শিক্ষকের দাবি, ১৯৯৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। দায়িত্ব হস্তান্তরের পর বিদ্যালয়ের ফলাফল ও শিক্ষার্থী ভর্তির হার কমেছে বলেও তিনি দাবি করেন। তার বিরুদ্ধে করা মামলা ও অপপ্রচারকে তিনি ষড়যন্ত্রমূলক উল্লেখ করে আইনি ও দাপ্তরিকভাবে জবাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এদিকে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পটিয়া থানার এসআই ফরহাদ সিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা-সংক্রান্ত বিষয়ে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারীকে ধমক দেওয়া এবং প্রমাণাদি যথাযথভাবে যাচাই না করার অভিযোগও তুলেছেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তবে এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।