১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ডা.এম.এ.মান্নান,
ছবি: লেখক: শুভঙ্কর সাহা
শহীদ দিবস আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—দুই-ই একই দিন। ইংরেজি পঞ্জিকা হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি। ইতিহাস সাক্ষী ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি নিজের মাতৃভাষা রক্ষা করার জন্য বাংলার মাটিতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রাজপথে রফিক, সালাম, বরকত, শফিউর, জব্বাররা। রাজপথের এই রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি বাংলাকে মা বলে ডাকবার অধিকার, পেয়েছি মায়ের ভাষা—আমার বাংলা ভাষা। তাই ২১ শুধু একটি সংখ্যা নয়, দিনপঞ্জিকার একটি দিন নয়—অমর ২১ প্রতিবছরই আমাদের শক্তি ও সাহস জোগায়, দেশপ্রেম ও ভাষা চেতনাকে শাণিত করে। বাঙালি জাতির আত্মত্যাগের সাথে মিশে আছে এই ২১শে ফেব্রুয়ারি।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আত্মত্যাগের নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টিকারী শহিদদের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর শ্রদ্ধা স্বরূপ একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ করে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পরের বছর থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি শহিদ দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। এদিন বাঙালি জাতি রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করে বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তাই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০০০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে দিনটি সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে যতটুকু জানা তা পাঠ্যপুস্তক আর কিছু পড়াশোনার কারণে। ছোট সময়ে একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল আমার কাছে উৎসবের দিন হিসেবে পরিচিত। কারণ স্কুলের উঠোনে শহিদ মিনার বানানো, বিভিন্ন জায়গা থেকে ফুল সংগ্রহ করে শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, খালি পায়ে হেঁটে প্রভাতফেরিতে অংশ নেওয়া—এসব আমাদের শৈশবের এক ধরনের অনুভূতির জন্ম দিত। একসময় পাঠ্যপুস্তকে একুশের গল্প পড়তে গিয়ে অনেক দিন মনে দাগ কেটেছে। যতবার পড়তাম ততবার এক ধরনের বেদনায় ভেসে যেতাম, কিন্তু একুশের চেতনায় মন উজ্জীবিত হয়ে উঠত।
একুশের মূল চেতনা ছিল রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা। দেশের সকল মানুষ যাতে নিজের ভাষায় লিখতে-পড়তে পারে সেটি নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে কি তাই হয়েছে? এখনও সর্বস্তরে বাংলা চালু হয়নি। উচ্চ আদালত, প্রশাসনসহ সর্বত্র ইংরেজির দাপট। এমনকি ডাক্তারদের ব্যবস্থাপত্রও লেখা হয় ইংরেজিতে। সাইনবোর্ড, ব্যানার, বিলবোর্ড, ফেস্টুন, বিজ্ঞাপনে অপ্রয়োজনীয় ইংরেজির ছড়াছড়ি। যদিও দেশের বিশাল সংখ্যক মানুষ এখনও অক্ষর জ্ঞানহীন। তাই প্রকৃত অর্থে ভাষা আন্দোলন এখনও শেষ হয়ে যায়নি। যতদিন একজন মানুষও নিরক্ষর থাকবে ততদিন ভাষা আন্দোলন চলবে।
গ্লোবাল ভিলেজের নাগরিক আমাদের তো নিজের ভাষার চেয়ে গ্লোবাল ভাষা আয়ত্তে রাখা বেশি জরুরি—দাবিটি একেবারে অমূলক নয় সত্য; কিন্তু একথা মানবিকতার মানুষদের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক আগেই বলে গেছেন—“আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তার পরে ইংরেজি শেখার পত্তন।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনাই হচ্ছে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। আর এ দায় শুধুই বাঙালির নয়, পৃথিবীর সকল মানুষের। একুশ তখনই সার্থক হবে যখন প্রত্যেক জনগোষ্ঠী তার নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারবে, এই ভাষায় শিক্ষা লাভ করতে পারবে, শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারবে। একুশের চেতনা তখনই জেগে উঠবে সবার মধ্যে।
আমরা ২১শে ফেব্রুয়ারি নিয়ে যতটা মাতামাতি করি, সেই দিনের বাংলা তারিখ ৮-ই ফাল্গুন যেন ক্রমেই আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ১৯৫২ সালের সেই রক্তঝরা দিনটি ছিল ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৮-ই ফাল্গুন, বৃহস্পতিবার। প্রকৃতির বুকে ছিল পলাশ-শিমুলের আগুনরাঙা রং, আর বাংলার মাটিতে মিশেছিল রফিক-সালাম-বরকতদের রক্ত।
৮-ই ফাল্গুনকে বাদ দিয়ে সেই সময়ের আবহ বা বসন্তের রং ফুটে ওঠে না। বাঙালির চেতনা ও সংস্কৃতির সাথে বাংলা পঞ্জিকার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। অথচ বর্তমানে আমরা আমাদের নিজস্ব পঞ্জিকার চেয়ে ইংরেজি তারিখের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ৮-ই ফাল্গুনের গুরুত্ব তুলে না ধরলে আমাদের ভাষা প্রেমের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তাদের কাছে অধরাই থেকে যাবে। তাই সংবাদপত্র, গণমাধ্যম এবং যেকোনো অনুষ্ঠানে ২১শে ফেব্রুয়ারির পাশাপাশি ৮-ই ফাল্গুন তারিখটি সমান গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা প্রয়োজন। যদি এই দুই তারিখের সমন্বয় ঘটানো যায়, তবে তা আমাদের শেকড়ের প্রতি আরও সম্মান প্রদর্শন করবে।