১৭ অক্টোবর ২০২৬
হোম স্বাস্থ্য সারাদেশ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি ও বাণিজ্য খেলাধুলা বিনোদন আন্তর্জাতিক ধর্ম ও জীবন লাইফ স্টাইল শিক্ষা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান পরিবেশ চাকরি বা ক্যারিয়ার মতামত আইন-আদালত কৃষি ও প্রযুক্তি বিশেষ সংবাদ অপরাধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্বকাপ ফুটবল
অপরাধ / সারাদেশ

ভোলাহাটে জৈবসার প্রয়োগের পর কৃষকের ২ বিঘা জমির শসার চারা নষ্ট, দিশেহারা সমির প্রায় লাখ টাকা বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হওয়ার শঙ্কা, ডিলারের বিরুদ্ধে কৃষকের অভিযোগ

১৬ অক্টোবর, ২০২৬

মোঃ শরিফুল ইসলাম (শরীফ),
ভোলাহাট উপজেলা (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি

ছবি: ভোলাহাটের খড়কপুর গ্রামে কৃষক সমির উদ্দিনের ২ বিঘা জমির শসার চারার ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থা। পাশে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সমির উদ্দিন।

ভোলাহাট উপজেলা (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি:

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে জৈবসার প্রয়োগের পর কৃষক সমির উদ্দিনের ২ বিঘা জমির শসার চারার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ধারদেনা ও ঋণের টাকা বিনিয়োগ করে গড়ে তোলা শসার ক্ষেতের এমন বেহাল দশায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ডিলারের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাগন ব্র্যান্ডের জৈবসার কেনার পর জমিতে প্রয়োগ করেন। পরদিনই চারার গোড়ায় পচন ও দুর্বলতা দেখা দেয়। একপর্যায়ে পুরো জমির শসার চারাই নষ্ট হয়ে যায়। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক দায় নিরূপণ, সঠিক তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।

সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার ৩ নম্বর দলদলী ইউনিয়নের খড়কপুর গ্রামের কৃষক সমির উদ্দিন শীতকালীন শসা চাষের জন্য ২ বিঘা জমিতে চারা রোপণ করেন। ফলন ভালো পাওয়ার আশায় গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একই ইউনিয়নের আলীমোড় এলাকার ‘মেসার্স মনিরুল ট্রেডার্স’ থেকে প্রতি বস্তা ৪৫০ টাকা দরে ‘প্যারাগন’ ব্র্যান্ডের তিন বস্তা জৈবসার কেনেন। ওই দিনই তিনি জমিতে সার প্রয়োগ করেন।

কৃষকের ভাষ্য অনুযায়ী, পরদিন ১৫ অক্টোবর জমিতে গিয়ে তিনি শসার চারার গোড়ায় পচন ও গাছের দুর্বলতা দেখতে পান। চারাগুলো হাতে নিয়ে পরীক্ষা করার পর তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে পুরো জমি ঘুরে অধিকাংশ নয়, বরং জমির সব চারাই নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় দেখতে পান বলে দাবি করেন তিনি।

ধারদেনা করে চাষ, এখন দিশেহারা কৃষক

কৃষক সমির উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ধারদেনা করে, ঋণের কিস্তি ও মহাজনের কাছ থেকে দাদনে টাকা নিয়ে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ করে শসার চাষ করেছিলাম। আশা ছিল, ভালো ফলন হলে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা মুনাফা করতে পারব। সেই টাকা দিয়ে দেনাপাওনা পরিশোধ করব। কিন্তু এখন আমার সব শেষ হয়ে গেল। এ বছর আর শসার চাষ করতে পারব কি না, জানি না।”

তিনি আরও বলেন, “আগের দেনাই পরিশোধ করতে পারিনি। এখন নতুন করে টাকা চাইলে কেউ দিতে চাইবে না। আমি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াব—তা বুঝতে পারছি না।”

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের দাবি, তাঁর জমির চারাগুলো নষ্ট হওয়ার পেছনে ব্যবহৃত জৈবসারের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। একই সঙ্গে তাঁর আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সরেজমিন পরিদর্শন

ঘটনার খবর পেয়ে কৃষকের জমিতে সরেজমিন তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সুলতান আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাইরে থাকার কথা জানান। পরে তাঁর দপ্তরের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান, সহকারী ইউনিয়ন কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসিরুল ইসলাম, মো. মুকুল আলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

এ সময় তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও শসার চারার অবস্থা পরিদর্শন করেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত জৈবসারের নমুনা এবং জমিতে প্রয়োগ করা সার সংগ্রহ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ডিলারের গোডাউনে থাকা অবশিষ্ট ৫৭ বস্তা প্যারাগন জৈবসার বিক্রি না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। পরীক্ষার ফলাফল না আসা পর্যন্ত সারটির মান, ব্যবহারবিধি কিংবা চারাগাছ নষ্ট হওয়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

ডিলারের পরামর্শ নিয়ে প্রশ্ন, দায় এড়ানোর অভিযোগ

কৃষক সমির উদ্দিনের দাবি, ‘মেসার্স মনিরুল ট্রেডার্স’-এর মালিকের ছেলে মো. আহসান আলী তাঁকে শসার চারার গোড়ায় ওই জৈবসার ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এ-সংক্রান্ত প্রমাণাদি তাঁর কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন কৃষক।

অন্যদিকে, আহসান আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সার ব্যবহারের নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণে এমন পরিস্থিতি হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন। তবে কৃষকের অভিযোগ অনুযায়ী, সার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়ার বিষয়টি এবং সার প্রয়োগের পরপরই চারার ক্ষতি হওয়ার ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ও পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।

উপজেলার সন্ন্যাসীতলা মোড়ের ‘মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স’-এর ডিলার মো. রাফিজুল ইসলাম ডাবলুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সার প্রয়োগে ত্রুটি থাকতে পারে বলে মত দেন। একই সঙ্গে প্যারাগন জৈবসারকে একটি পরিচিত ব্র্যান্ডের সার বলেও উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, প্যারাগন জৈবসারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা সারটির গুণগত মান নিয়ে আস্থা প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে সারটি ফসলের উর্বরতা বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরীক্ষায় সারটির ত্রুটি প্রমাণিত হলে তাঁরা দায় নিতে প্রস্তুত বলেও জানান।

এখন প্রশ্ন—ক্ষতির দায় নেবে কে?

একজন কৃষক ধারদেনা করে ফসল ফলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই ফসলের চারাগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগের পর এখন তাঁর সামনে ঋণ পরিশোধ ও নতুন করে চাষাবাদ শুরু করার কঠিন চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় শুধু বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জৈবসারের মান, প্রয়োগপদ্ধতি এবং চারাগাছ নষ্ট হওয়ার সম্ভাব্য কারণ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।

পরীক্ষায় সারটির ত্রুটি কিংবা ভুল পরামর্শের কারণে ক্ষতির বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ন্যায্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষিসংশ্লিষ্টরা।

ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে জৈবসারের নমুনা, ফল পেতে লাগতে পারে ১–২ মাস

কৃষক সমির উদ্দিনের অভিযোগের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন উপজেলা কৃষি দপ্তরের কর্মকর্তারা। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত জমির অবস্থা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি জমিতে প্রয়োগ করা জৈবসার এবং ডিলারের দোকানে থাকা একই ব্র্যান্ডের জৈবসারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান সাংবাদিকের উপস্থিতিতে মৌখিকভাবে জানান, জমি ও ডিলারের দোকান—উভয় স্থান থেকেই জৈবসারের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে এক থেকে দুই মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলেও তিনি জানান।

এদিকে, ডিলারের গোডাউনে থাকা অবশিষ্ট ৫৭ বস্তা প্যারাগন জৈবসার বিক্রি না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে ঘটনাস্থলে জানা যায়। তবে নমুনা পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত জৈবসারের গুণগত মান, প্রয়োগপদ্ধতি কিংবা শসার চারাগাছ নষ্ট হওয়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, পরীক্ষার ফল পেতে যদি এক থেকে দুই মাস সময় লাগে, তাহলে এরই মধ্যে প্রায় এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সমির উদ্দিন কীভাবে তাঁর ঋণ ও দেনা পরিশোধ করবেন? তাঁর ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ, দায় নির্ধারণ এবং ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

কৃষক সমির উদ্দিনের এখন একটাই প্রত্যাশা—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক, প্রকৃত দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারিত হোক এবং তাঁর ক্ষতির ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করা হোক।

Related Article
comment
মোঃ মনির হোসেন বকাউল
29-Sep-23 | 10:09

Good news

মোঃ মনির হোসেন বকাউল
10-Dec-23 | 04:12

Good

আঃ হালিম সরদার
05-Aug-26 | 06:08

wonderful news